লজ্জাস্থান ও মহিলাদের পর্দা
ব্যাক্তির জন্য তার নিজ দেহের যেসব স্থানকে উম্মুক্ত করা,অন্যকে প্ৰদৰ্শন করা কিংবা অন্য কারো জন্য ব্যাক্তির যেসব স্থান দর্শন করা হারাম তা লজ্জাস্থান বা ‘আওরাত’ হিসেবে বিবেচিত। পুরুষদের ক্ষেত্রে আওরাত হলো নাভী থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত। হাঁটু আওরাতের অন্তর্ভুক্ত। এসব স্থান উম্মুক্ত থাকা অবস্থায় যে নামাজ আদায় করা হয় তা কবুল হয় না। নামাজ আদায়ের সময় পুরুষদের জন্য দেহের অন্যান্য অংশ যেমন পিঠ,বক্ষ,মাথা,হাত ইত্যাদি ঢাকা সুন্নাত। দেহের এসব অংশ অনাবৃত রেখে নামাজ আদায় করা মাকরুহ্
মহিলাদের হাতের তালু পায়ের পাতা ও মুখমণ্ডল ব্যাতীত সমস্ত দেহ আওরাত হিসেবে পরিগণিত হয়। চার মাজহাব অনুযায়ীই হাতের উপরের অংশ, চুল ও পা আওরাতের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি একারণে মহিলাদের আওরাতও বলা হয়। আওরাতের অন্তর্ভুক্ত অঙ্গসমূহকে আবৃত করা ফরজ। নামাজের সময় আওরাতের অন্তর্ভুক্ত অঙ্গসমূহের যে কোন একটির একচতুর্থাংশ বা তার বেশি অংশ, কোন রুকন আদায়ের পুরো সময় ধরে অনাবৃত থাকলে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যায়। এর চেয়ে কম অংশ অনাবৃত হলে নামাজ ভঙ্গ হবে না তবে নামাজ মাকরুহ হবে। যে পোষাক বা কাপড় খুবই পাতলা কিংবা যার দ্বারা শরীরের অবয়ব বা রঙ প্রকাশিত হয় তা শরিয়তের দৃষ্টিতে পোষাক হিসেবে বিবেচিত হয় না।
মহিলাদের জন্য নামাজের বাইরে একাকী থাকা অবস্থায়,হাটু থেকে নাভী পর্যন্ত আবৃত করা ফরজ একইসাথে বুক ও পিঠ ঢাকা ওয়াজিব এবং শরীরের অন্যান্য অংশ আবৃত করা মুস্তাহাব।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন “পরনারীর প্রতি কামনার দৃষ্টিতে তাকানো ব্যাক্তির চক্ষুগুলিকে আগুনে পূর্ণ করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। পরনারীকে কামনার সাথে স্পর্শকারী ব্যাক্তির হাতকে গর্দানের সাথে বেঁধে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আর পরনারীর সাথে অপ্রয়োজনে কামনার সাথে কথা বললে, প্রত্যেক শব্দের জন্য হাজার বছর জাহান্নামে থাকতে হবে”,
অপর এক হাদিস শরীফে বলা হয়েছে যে “প্রতিবেশী নারী ও বন্ধুর স্ত্রীদের প্রতি কামনার দৃষ্টিতে তাকানো, পরনারীদের দিকে তাকানোর চেয়ে দশগুণ বেশী গুনাহের কাজ। বিবাহিত নারীদের দিকে তাকানো, অবিবাহিত মেয়েদের দিকে তাকানোর চেয়ে হাজার গুণ বেশী অপরাধের কাজ। আর যিনার গুনাহও এরূপ অধিক হয়” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন “হে আলী! তোমার উরুদেশ কখনো উম্মুক্ত করো না। আর জীবিত কিংবা মৃত কখনোই কারো উরুদেশের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করো না”
অন্য আরেক হাদিস শরীফে বলা হয়েছে যে “তোমাদের গোপনাঙ্গ কখনো উম্মুক্ত করো না। কেননা,তোমাদের সাথে এমন কেউ আছে যারা কখনোই তোমাদের থেকে আলাদা হয় না। অতএব তাদের ব্যাপারেও লজ্জিত হও এবং তাদের মর্যাদা রক্ষা করে চল”। (এরা হলো হাফাজা ফেরেশতা)
হাদিস শরীফে আরো বলা হয়েছে যে, “লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখা৷ নিজেদের স্ত্রী ও জারিয়া ব্যাতীত অন্য কারো সামনে তা উম্মুক্ত করো না। আর একাকী থাকা অবস্থায়ও মহান আল্লাহ্র থেকে লজ্জা পাও”,
“মহিলার বেশভূষা ধারণকারী পুরুষদের ও পুরুষের বেশভূষা ধারণকারী মহিলাদের উপর মহান আল্লাহ্র অভিশাপ বর্ষিত হোক”
“কোন নারীর সৌন্দর্য দর্শনকারী পুরুষ তৎক্ষণাৎ তার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলে,মহান আল্লাহ্ তায়ালা তাকে এমন একটি নতুন ইবাদতের সওয়াব প্রদান করেন যার স্বাদ ঐ ব্যাক্তি তৎক্ষণাৎ উপভোগ করে”।
“নিজের গোপনাঙ্গকে উম্মুক্তকারী ও অন্যের গোপনাঙ্গের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপকারী ব্যাক্তির উপর আল্লাহ্ তায়ালার অভিশাপ বর্ষিত হোক” “নিজেকে যে জাতির রূপে প্রকাশ করবে, ব্যাক্তি সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে”। এর অর্থ হলো, ব্যাক্তি আচার-আচরণ, চরিত্র, কাজকর্ম কিংবা পোশাকের দিক থেকে যাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে,তাদের থেকেই বিবেচিত হবে। ফ্যাশনের নামে অমুসলিমদের প্রথাকে অনুকরণকারী,হারাম কাজকর্মকে শিল্প হিসেবে বিবেচনাকারী, হারামে লিপ্তদের শিল্পী নায়ক নায়িকা, আধুনিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানকারীরা উপরোক্ত হাদিস শরীফগুলি থেকে শিক্ষা নিক এ ব্যাপারে তাদের শঙ্কিত হওয়া উচিত এবং সচেতন হওয়া উচিত।
পুরুষের জন্য অপর পুরুষের এবং নারীর জন্য অপর নারীর লজ্জাস্থানের দিকে তাকানোও হারাম। দেখা যাচ্ছে যে,যেমনিভাবে পুরুষের জন্য মহিলাদের প্রতি আর মহিলাদের জন্য পুরুষের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানো হারাম,ঠিক একইভাবে পুরুষের জন্য অপর পুরুষের লজ্জাস্থানের প্রতি ও নারীর জন্য অপর নারীর লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টি দেয়াও হারাম। পুরুষের পুরুষের জন্য ও নারীর জন্য আওরাতের স্থান হলো,হাটু থেকে নাভী পর্যন্ত। নারীর অপর নারীর জন্য আওরাতের স্থানও পুরুষদের মত। তবে নারীর পরপুরুষের জন্য আওরাতের স্থান হলো, হাতের তালু ও মুখমণ্ডল বাঁধে সমস্ত শরীর। পরনারীর প্রতি কামনাহীন দৃষ্টিতে তাকানোও হারাম। কম্বল বা চাদরের নিচে উলঙ্গ অবস্থায় শায়িত কোন রোগী,মাথা চাদরের ভিতরে রেখে ইশারায় নামাজ আদায় করলে উলঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হবে বিধায় নামাজ বাতিল হবে। মাথা চাদর থেকে বের করে নামাজ আদায় করলে,চাদর দ্বারা আবৃত হিসেবে আদায় হবে এবং জায়েজ হবে।
পুরুষের জন্য মাহরেম তথা চিরস্থায়ীভাবে যাদেরকে বিবাহ করা হারাম,এমন আঠার ধরণের নারীর মাথা, মুখমণ্ডল, ঘাড়, হাত ও হাঁটুর নিচের অংশের প্রতি কামনার উদ্রেক হবে না এব্যাপারে নিশ্চিত হলে তাকাতে পারে। তবে তাদের বক্ষ,পেট,বগল,রান,হাঁটু ও পিঠের দিকে তাকাতে পারবে না।
নারীর জন্য চাচাতো, খালাতো, মামাতো ও ফুফাতো ভাইরাও পরপুরুষ হিসেবে বিবেচিত। ফুফা, খালু দুলাভাই ও দেবরও পরপুরুষ হিসেবে গণ্য হয়। অতএব এদের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা,ঠাট্টাতামাসা করা কিংবা নির্জনে অবস্থান করা হারাম। পুরুষদের ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে চাচাতো,খালাতো,মামাতো ও ফুফাতো বোনদের সাথে এবং ভাবী ও শালীদের সাথে একান্তে অবস্থান করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা হারাম।
পুরুষের জন্য মাহরেম হিসেবে বিবেচিত আঠার ধরণের নারীর সাথে আজীবন বিবাহ করা অসম্ভব। এদেরসাথে কথাবার্তা বলতে পারে, একান্তে কোন স্থানে অবস্থান করতে পারে। নারীও অনুরূপভাবে আঠার ধরণের পুরুষের সাথে কখনোই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। এই আঠার ধরণের নারী ও পুরুষ নিম্নরূপ
পুরুষের জন্য মাহরেম হিসেবে বিবেচিত আঠার ধরণের নারীর
১. বাবা। বংশগত কারণে মাহরেমগণ :
২.বাবা ও মায়ের বাবাগণ। অর্থাৎ দাদা ও নানা৷
৩.ছেলে এবং ছেলে ও মেয়ের ছেলে অর্থাৎ নাতি'
৪.ভাই।
৫.ভাইয়ের ছেলে অর্থাৎ ভাতিজা'
৬ বোনের ছেলে অর্থাৎ ভাগিনা
৭.চাচা ও মামা।
নারী
১. মা।
২. মা ও বাবার মায়েরা। অর্থাৎ দাদী ও নানী।
৩.মেয়ে এবং ছেলে ও মেয়ের মেয়ে অর্থাৎ নাতনি।
৪. বোন।
৫. বোনের মেয়ে অর্থাৎ ভাগিনী।
৬. ভাইয়ের মেয়ে অর্থাৎ ভাতিজী।
৭. খালা ও ফুফী।
দুধপানের কারণে মাহরেম
পুরুষ
৮. দুধপিতা।
৯.দুধপিতা ও দুধমাতার পিতা।
১০.দুধ পানকারী ছেলে এবং দুধ পানকারী ছেলে ও মেয়ের ছেলে।
১১.দুধভাই।
১২.দুধভাইয়ের ছেলে।
১৩ দুধবোনের ছেলে।
১৪.দুধচাচা ও দুধমামা।
নারী:
৮.দুধমাতা।
৯.দুধপিতা ও দুধমাতার মাতা।
১০.দুধপানকারী মেয়ে এবং দুধপানকারী ছেলে ও মেয়ের মেয়ে।
১১. দুধবোন।
১২. দুধবোনের মেয়ে।
১৩.দুধভাইয়ের মেয়ে।
১৪. দুধখালা ও দুধফুফু।
পুরুষ
১৫. শ্বশুর।
১৬ সৎছেলে।
১৭ সৎবাবা।
১৮.মেয়ের জামাই ।
নারী:
১৫ শ্বাশুরি
১৬ সৎমেয়ে।
১৭ সৎমা।
১৮. পুত্রবধু।
বৈবাহিক কারণে মাহরেম
লজ্জাস্থানকে উম্মুক্ত রেখে যারা বাইরে বের হয় এবং যারা অন্যের লজ্জাস্থানের দিকে দৃষ্টি দেয় এমন নারী ও পুরুষ উভয়ই জাহান্নামের অতি উত্তপ্ত জলন্ত আগুনে পুড়বে।
